
গোলাম জিলানী দিরাই :
সুনামগঞ্জ:হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যা, জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি থেকে উত্তরণের দাবিতে সরব হয়েছে সিলেটস্থ দিরাই-শাল্লা জাতীয়তাবাদী ফোরাম। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালিয়ারগুঠা হাওরে সরেজমিন পরিদর্শন, কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়, বর্জপাতে নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি প্রদানসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
দিনব্যাপী এ কর্মসূচিতে অংশ নেন ফোরামের আহ্বায়ক জনাব গোলাপ মিয়া, সদস্য সচিব জনাব কামরুল ইসলামসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
হাওর পরিদর্শন ও কৃষকদের সাথে সরাসরি সংলাপ
কর্মসূচির শুরুতেই ফোরামের নেতৃবৃন্দ কালিয়ারগুঠা হাওর পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তারা হাওরের বর্তমান পরিস্থিতি, ফসলের অবস্থা, জলাবদ্ধতার চিত্র এবং কৃষকদের দুর্ভোগ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মতবিনিময় করেন নেতৃবৃন্দ। কৃষকরা জানান, প্রতি বছর আগাম বন্যা, অকাল বৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতার কারণে তাদের বোরো ফসল ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফসল ঘরে তোলার আগেই পানির নিচে তলিয়ে যায়, ফলে তাদের বছরের একমাত্র আয়ের উৎস নষ্ট হয়ে যায়।
একজন কৃষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,
“আমাদের সব কিছুই এই হাওরের উপর নির্ভর করে। কিন্তু পানি নিয়ন্ত্রণের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় আমরা প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।”
আহ্বায়কের বক্তব্য: “হাওর বাঁচলে কৃষক বাঁচবে”
এ সময় ফোরামের আহ্বায়ক জনাব গুলাপ মিয়া বলেন,
“হাওর অঞ্চলের কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা না নিলে কৃষকরা চরম বিপদের মুখে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “হাওর বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, আর কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই সরকারের প্রতি আমাদের জোর দাবি—হাওরাঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।”
সদস্য সচিব জনাব কামরুল ইসলাম বলেন,
“প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, কিন্তু কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেখা যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুধু অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন,“হাওরপারের মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এ অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়বে।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন— উপদেষ্টা সদস্য সামছুল আলম তালুকদার,সদস্য সেকুল মিয়া,কাইয়ুম উদ্দিন,আলী আহসান হাবীব,ফজলু মিয়া,সুয়েব খাঁন, রুমান আহমদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
নেতৃবৃন্দ একযোগে কৃষকদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনে জোর দাবি মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, হাওর অঞ্চলে জলাবদ্ধতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকে, যা ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
তারা সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবিগুলো তুলে ধরেনঃ
স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা হাওর ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বন্ধ কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে হাওর উন্নয়ন বজ্রপাতে নিহত লিটন মিয়ার পরিবারের পাশে ফোরাম কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে ফোরামের নেতৃবৃন্দ দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামের বজ্রপাতে নিহত লিটন মিয়ার বাড়িতে যান।
সেখানে গিয়ে তারা শোকাহত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন।
এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহতের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং নেতৃবৃন্দ তাদের সান্ত্বনা দেন।
ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা নিহতের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং পরিবারটির পাশে থাকার অঙ্গীকার করছি।” তারা পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দেন এবং সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
নেতৃবৃন্দ নিহত লিটন মিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া করেন। একই সঙ্গে তারা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সমাজের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
দিনব্যাপী কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে ফোরামের পক্ষ থেকে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নিকট একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা, জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রয়োজনীয়তা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি তুলে ধরা হয়।
এতে উল্লেখ করা হয়— হাওর অঞ্চলের কৃষকদের টিকে থাকার জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, অন্যথায় খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ঘোষণা ফোরামের নেতৃবৃন্দ জানান, হাওরাঞ্চলের সমস্যা সমাধানে তারা ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন তারা।
কালিয়ারগুঠা হাওর পরিদর্শন, কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়, দুর্গত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রশাসনের কাছে দাবি তুলে ধরার মাধ্যমে দিরাই-শাল্লা জাতীয়তাবাদী ফোরাম একটি দায়িত্বশীল সামাজিক ও জনমুখী সংগঠন হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।