ভারত-চীনসহ ৪ দেশের জাহাজে হরমুজ প্রণালিতে ছাড় ইরানের

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করে ইরান। কৌশলগত এই নৌপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হতো। পরবর্তীতে জুলাই মাসে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এই চার দেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চারটি দেশই হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী কাতার আগস্টে এই প্রণালি দিয়ে কোনো এলএনজি পরিবহন করতে পারেনি। তবে অক্টোবরে দেশটি ১৮ লাখ টন এলএনজি পরিবহন করেছে বলে জানান শু। শু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের উৎস শনাক্ত করতে পারেনি কেপলার। তবে ট্রাম্পের আচরণে দুই দেশই হতাশ হয়েছে।’। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে, ‘ইরান থেকে আসা বা ইরানের উদ্দেশে যাত্রা করা চীন ও ভারতের জাহাজও এই ছাড়ের আওতায় আসবে।’।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কৌশলে হাঁটছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম জানিয়েছেন, ইরান সরকার ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করা বিধিনিষেধ থেকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে। এই দেশগুলোর জাহাজ এখন অবাধে চলাচল করতে পারছে এবং মার্কিন বাহিনীও সেগুলোতে আপাতত বাধা দিচ্ছে না।

জাহাজ চলাচলের বিনিময়ে ইরান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ফায়দা নিশ্চিত করতে চায়। সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার হায়াত মোকাদ্দামের ভাষ্যমতে, ইরান ভারত থেকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাশা করছে। অন্যদিকে, কাতার ইতিমধ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং দেশটিকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িত’, যোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাজার আবারও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হায়াত মোকাদ্দাম স্পষ্ট করেছেন যে, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ইরান ট্রানজিট ফি আদায় করবে। তবে কাতারের জাহাজগুলো বিনা মাশুলে চলাচলের অনুমতি পাবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে মাশুলের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, ইরাককে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে ইরান তার শিয়াপ্রধান প্রতিবেশী দেশটির অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে চাইছে। ইরাকি জাহাজকে মাশুল দিতে হবে কি না, তা তিনি জানাননি। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং লিবিয়ায় অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুস্তাই আল জাজিরাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে তেহরান এই উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে। এই উদ্যোগ সফল হলে ইরান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে। সেন্টকম আরও জানিয়েছে, ‘বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজ তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।’। তিনি বলেন, ‘সমঝোতার বিষয়টি সত্যি হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ওপরও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।’।

সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রুজবে পারসি মনে করেন, এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, ট্রানজিট ফি আদায়ের মাধ্যমে ইরান তার হারানো রাজস্বের একটি অংশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। এছাড়া চীন ইরানের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে, তাই তাদের জন্য এই প্রণালি দিয়ে চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাজার বিশ্লেষক মিউ শু জানিয়েছেন, অক্টোবরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে, যার প্রায় ৪২ শতাংশ গিয়েছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে। কাতার ও ইরাকের তেল পরিবহনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এই দেশগুলোর জন্য ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক আচরণে কাতার ও ভারত উভয়ই বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে। ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবে পারসি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। একই সময়ে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইরাকের ক্ষেত্রে তা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল হয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের একটি প্রস্তাব।

এই ছাড়ের আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের অবরোধ ইরানের সব বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর প্রযোজ্য। তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজ বা অত্যাবশ্যকীয় মানবিক পণ্যবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এদিকে, ইরানের পারমাণবিক আলোচনা ও অবরোধ প্রত্যাহারের সাতটি শর্তের মধ্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় বসার আগে অবরোধ প্রত্যাহার তেহরানের অন্যতম শর্ত। আপাতত সবার নজর বৃহত্তর একটি চুক্তির সম্ভাবনার দিকে।’।

পুস্তাইয়ের মতে, ইরান সম্ভবত তেল রপ্তানি ও নৌচলাচলকে পারমাণবিক ইস্যু থেকে আলাদা রেখে একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করতে চাইছে। তবে এই ছাড়ের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। এটি কি জাহাজের পতাকাবাহী দেশ, নাকি মালিকানা বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হচ্ছে, তা এখনো অস্পষ্ট।

বাজারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আইজি গ্রুপের ক্রিস বিউচ্যাম্পের মন্তব্য হলো, আপাতত এসব ছাড়ের অর্থনৈতিক প্রভাব খুবই সীমিত।

বিনিয়োগকারীরা এখনো বড় কোনো শান্তিচুক্তির দিকে তাকিয়ে আছেন।

তবে নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি।

কাতার গ্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির জাহাজ ‘আল মায়েদা’ গত ৩০ অক্টোবর অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে ১২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার তথ্য রয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে তুলে ধরে।