সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে শয্যা সংকট: এক বেডেই তিন শিশু রোগী

রাজধানীর শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে বর্তমানে নির্ধারিত শয্যার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। আড়াই বছরের শিশু মাহিন ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে সাতদিন ধরে এখানে চিকিৎসাধীন। শয্যা না থাকায় মাহিনসহ আরও দুই শিশুকে একই বেডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মাহিনের বাবা শরীফুল শিকদার জানান, নার্স ও চিকিৎসকরা আন্তরিকভাবে সেবা দিলেও একই বিছানায় একাধিক শিশু থাকায় ওষুধ খাওয়ানো বা মায়ের দুধ পান করানোর মতো প্রয়োজনীয় সেবা দিতে তাদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। সরজমিন সোহ্‌রাওয়ার্দীর ডেঙ্গু ওয়ার্ড। তবে এক শয্যায় দু’-তিনজন শিশুকে রাখায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হলে ছেলেকে নিয়ে সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন তারা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও খরচ তুলনামূলক কম। প্রথমে বাড়িতে দুই থেকে তিনদিন চিকিৎসা নেন তিনি। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার চেয়ে ২৯ জন বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে অক্সিজেন দিতে হয়। এতে শিশুদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্বজনদের অবস্থান নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়।

ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৩ বছর বয়সী আকাশ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। তার মা জাহানারা বেগম জানান, মানিকগঞ্জ থেকে আসার পর থেকে এখানে ভালো চিকিৎসা মিলছে এবং আগের চেয়ে ছেলে অনেকটা সুস্থ। এদিকে ৩রা নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভোলা থেকে আসা নিঠুর দে জানান, প্রায় সাতদিন আগে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর এখানে এসে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার অসুস্থতায় স্বজনরা বেশ উদ্বিগ্ন। একই অবস্থা ৬০ বছর বয়সী কমলা ঠাকুরের, যিনি শ্বাসকষ্ট ও ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর উন্নতির পথে রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি তাদের পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। বর্তমানে আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন। প্রায় এক মাস আগে জ্বর, ঠাণ্ডা ও গলাব্যথা নিয়ে অসুস্থ হন তিনি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮০ জন ডেঙ্গু রোগী এখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যেখানে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১৫১টি। এর মধ্যে পুরুষ ৬০, নারী ৫০ এবং শিশু ৭০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৮ জন ভর্তি হয়েছেন এবং ৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ৩০শে অক্টোবর থেকে ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং ৬০ জনের বেশি সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বিশেষ করে শিশু বিভাগের চিত্রটি বেশি উদ্বেগের। এখানে তিনটি ইউনিটের ৩০টি শয্যার বিপরীতে ৭০ জনের মতো শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর আগের দিন রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৭ এবং তার আগের দিন ছিল ৬০ জন। একপর্যায়ে এই ওয়ার্ডে ৯০ জনের বেশি রোগীও চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ, নারী ২ জন এবং ৩ শিশু জন। কোনো কোনো সময়ে ৩০ শয্যার শিশু ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৯০ জনের বেশি রোগীও চিকিৎসাধীন ছিলেন।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ২০টি শয্যার বিপরীতে প্রায়ই ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী রাখতে হয়। ১২ জন নার্স এই বিশাল সংখ্যক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খান, বিশেষ করে বিকাল ও রাতের পালায় কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা আফরোজ জানিয়েছেন, বর্তমানে ছাড়পত্র নেওয়া রোগীর চেয়ে ভর্তির হার বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছে। নার্সদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ শয্যার একটি ওয়ার্ডে কখনো ৪০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত রোগী রাখতে হয়। ওয়ার্ডের জন্য ১২ জন নার্স দায়িত্ব পালন করলেও রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলে তাদের পক্ষে সব কাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

ডা. ফারজানা শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি কোনো শিশুর তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত বমি, খাওয়ার অরুচি, পাতলা পায়খানা বা শরীরে কোথাও রক্তপাত হয়, তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। তবে শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ ও পান করতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব। অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক সেবা ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন।