নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০-৪৪০ টাকা বেশিতে এলপিজি বিক্রি

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ নভেম্বর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ঢাকার বাজারে এই সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের অন্তত ৩০০ থেকে ৪৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে। রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত এই গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দাম মানছেন না। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নামমাত্র পাওয়া যাচ্ছে। সিলিন্ডারের দাম ২৫০০ টাকা, ‘কুলাইতে না পেরে’ তামান্নারা এখন রান্না করেন লাকড়ি দিয়ে। মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় মো. সায়েম নামের এক দোকানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে চাইলে তিনি শুরুতে বলেন, গ্যাস নেই। পরে এই প্রতিবেদক বিক্রেতার ফোন নম্বর নিয়ে দুই ঘণ্টা পর কল দিয়ে গ্যাসের খোঁজ করলে তিনি প্রথমে পরিচয় জানতে চান।

শনিবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি দোকানে সরেজমিন দেখা যায়, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। বিইআরসি কমিশন বাড়ানোর পরও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৯৭৫ থেকে ২,০৬০ টাকা: সাড়ে ৫ বছরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দ্বিগুণের বেশি। মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকা এবং উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকার ৮টি খুচরা দোকান, ৪টি ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, সব দোকানে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। ২ হাজার ২৫০ টাকায় নিজে কিনেছেন বলে দাবি করেন এই বিক্রেতা। ঢাকার বাইরে গতকাল পাঁচটি উপজেলার বাজার ঘুরে দামের তথ্য নিয়েছেন প্রতিনিধিরা। দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার।

নতুন দামের কাঠামো অনুযায়ী, ১২ কেজির সিলিন্ডার আমদানিকারকদের মজুত ও বোতলজাতকরণ কমিশন ৮২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া পরিবেশকের কমিশন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে। তবে পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, এই কমিশন তাঁদের প্রকৃত খরচ মেটাতে যথেষ্ট নয়।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কমিশন মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার যাচাই করছে। তিনি আরও জানান, যারা সরাসরি আমদানি না করে অন্য উৎস থেকে কিনছে, তারাই মূলত বাজারে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কমিশন কাজ করছে। অন্যদিকে পরিবেশকদের অভিযোগ, সরবরাহে ঘাটতি আছে এবং কোনো কোনো কোম্পানিও বাড়তি দাম নিচ্ছে। কমিশনের দুজন সদস্য মাঠপর্যায়ে যাচ্ছেন।

দেশের প্রায় এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন, যার ৮০ শতাংশই গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত হয়। ২০১৫ সাল থেকে এলপিজির চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে এবং বর্তমানে বার্ষিক চাহিদা ১৮ লাখ টনের বেশি। এলপিজি খাতের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি আমদানিকারকদের দখলে। আমদানিকারকদের দাবি, বিশ্ববাজারে এলপিজির ঘাটতি রয়েছে এবং অধিকাংশ গ্যাস এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হচ্ছে। বাসায় গ্যাস–সংযোগ বন্ধ থাকায় ২০১৫ সাল থেকে দেশে এলপিজির চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনতে জাহাজ ভাড়াতেও বেশি খরচ হচ্ছে। কোম্পানির প্ল্যান্টে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে ট্রাকের।

বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (লোয়াব) ও বিইআরসি সূত্রমতে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং অক্টোবরে ১ লাখ ৪২ হাজার টনের কম এলপিজি আমদানি হয়েছে। তবে ৪ নভেম্বরের মধ্যেই আরও ৪০ হাজার ২০০ টন গ্যাস দেশে এসে পৌঁছেছে। লোয়াব জানিয়েছে, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের চেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বন্ধ বললেই চলে। আবার মজুত করার পর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ থেমে গেলে বড় রকমের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।

এদিকে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজার মতে, আমদানিকারকরা সক্ষমতা অনুযায়ী সরবরাহ করছেন, তাই বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান। লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরীও মনে করেন, যুদ্ধের উত্তেজনার বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দামের চেয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি, তবে যত্রতত্র বিক্রি ঠেকাতে তদারকি প্রয়োজন।

খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবু তাহের কোরেশী বলেন, নির্ধারিত কমিশন দিয়ে ঢাকার ভেতরে গ্যাস সরবরাহ করা অসম্ভব, কারণ পরিবহন খরচ অনেক বেশি। অনেক বিক্রেতা আবার সাংবাদিক বা ভোক্তা অধিকারের অভিযানের ভয়ে অপরিচিতদের কাছে গ্যাস নেই বলে অজুহাত দিচ্ছেন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, বাড়তি দামে বিক্রির তথ্য তাদের কাছে নিয়মিত আসছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। গত বৃহস্পতিবারও অভিযান চালানো হয়েছে, আগামীকালও এটা চলবে।’।

রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলার চিত্রও প্রায় একই। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, রাজশাহীর বাগমারা, পটুয়াখালীর বাউফল ও টাঙ্গাইলের সখীপুরের বিভিন্ন বাজারে সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সখীপুরের ডিলার জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহাঙ্গীর তালুকদার বলেন, কোম্পানি চাহিদামতো সরবরাহ করতে পারছে না বলে বাজারে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার পরিবেশক রফিকুল ইসলামের দাবি, খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেই তাঁরা ২ হাজার ২০ থেকে ৩০ টাকায় সরবরাহ করছেন। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে এলপিজির দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে এখানে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, তাড়াহুড়ো করে দাম নির্ধারণের ফলে মূলত ব্যবসায়িক বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হয়েছে। এলপিজির দাম বাড়লে ভোক্তা কমবে, যা অপারেটররা চান না।