অক্সফোর্ড ইউনিয়নে কাতারের প্রধানমন্ত্রী: শান্তি কোনো বিলাসিতা নয়

বিশ্বের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভাজনের মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সমতা বজায় রাখতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ছোট দেশগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আল-থানী। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়নে আয়োজিত এক বিশেষ সংবর্ধনা ও বক্তৃতা অনুষ্ঠানে তিনি এই মতামত পেশ করেন। তাঁর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘একটি বিভক্ত বিশ্বে সমৃদ্ধি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ এবং বৈশ্বিক প্রভাবের মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ’। এই অনুষ্ঠানে তিনি বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ছোট কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভূখণ্ডগুলোর গুরুত্ব বিস্তরভাবে ব্যাখ্যা করেন। আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও শান্তির প্রয়োজনীয়তা।

নতুন বৈশ্বিক শ্রেণিবিন্যাস ও ‘সমৃদ্ধ রাষ্ট্র’ ধারণা

প্রচলিত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের দ্বৈত বিভাজনকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বমঞ্চে ‘সমৃদ্ধ রাষ্ট্র’ নামে নতুন এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধারণার প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, যেসব দেশ নিজস্ব সীমিত আয়তনকে কৌশলী সুবিধায় রূপান্তর করেছে, শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে এবং বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক অংশীদার হয়েছে, তারা এই শ্রেণিতে পড়ে। যেসব দেশ মানবসম্পদের উন্নয়ন, উন্নত অবকাঠামো ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে সাফল্য পেয়েছে, তাদের দায়িত্ব কেবল নিজস্ব সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়। বরং একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়তে তাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যে দেশগুলো নিজেদের মানবসম্পদ, আধুনিক অবকাঠামো এবং টেকসই অর্থনৈতিক মডেলে বিনিয়োগ করে সফল হয়েছে, তাদের দায়িত্ব কেবল নিজের স্বার্থ দেখা নয়; বরং সম্মিলিত ও সুসংগঠিত উপায়ে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা।

আন্তর্জাতিক নিয়ম ও সামরিক শক্তির বাইরে শান্তি

১৯৪৫ পরবর্তী বৈশ্বিক ইতিহাস পর্যালোচনা করে শেখ মোহাম্মদ আল-থানী উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক শান্তি কখনোই শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না। এর পেছনে প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে সুনির্দিষ্ট আইন, আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সবার জন্য উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ১২০টিরও বেশি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের উত্থান ঘটেছে। এই পরিবর্তন ছোট দেশগুলোকে যেকোনো বড় শক্তির আধিপত্য থেকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ উন্মুক্ত করেছে।

বর্তমান ভারসাম্যহীনতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

যদিও বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে, তবুও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মূল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এখনও গুটিকয়েক শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি হয়ে আছে বলে সতর্ক করেন কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান উত্তেজনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে যেসব দেশ এই যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, তাদেরও মারাত্মক অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।

কাতারের মধ্যস্থতা ও মিথ্যা প্রচারণার জবাব

নিজ দেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, কাতার শুরু থেকেই অনুধাবন করেছে যে কেবল ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা সম্ভব নয়। বরং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন এবং নিজস্ব কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোই আসল শক্তি। এই দর্শন থেকেই আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী নয়, তারা কাতার ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী শক্তির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। এই ধরণের বাধাসত্ত্বেও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে এবং যুদ্ধকে কখনও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না।

শান্তি ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ

বক্তৃতার শেষাংশে শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল-থানী দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিলাসিতা ভাবার সুযোগ নেই; এটি যেকোনো দেশের টেকসই অগ্রগতির প্রথম শর্ত। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে কাতারের কূটনীতিকরা নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিষ্ক্রিয় দর্শক না থেকে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ইতিবাচক ইতিহাস গড়ার বার্তা দিয়ে নিজের বক্তব্য সমাপ্ত করেন। বর্তমান সংকটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও উত্তেজনা এড়াতে কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।