
মিয়াদ হাসান
স্টাফ রিপোর্টার
পবিত্র মাহে রমজান এলেই মুসলিম সমাজে একটি পুরোনো আলোচনা নতুন করে সামনে আসে—তারাবী নামাজ ৮ রাকাত, না ২০ রাকাত? দেশের বিভিন্ন মসজিদে দুই পদ্ধতিতেই তারাবী আদায় করতে দেখা যায়। আলেম-ওলামাগণ কোরআন, সহিহ হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমলের ভিত্তিতে নিজ নিজ মত উপস্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে প্রামাণ্য সূত্রের আলোকে একটি বিশদ পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।
পবিত্র কোরআনে তারাবী নামাজের নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা উল্লেখ নেই। তবে রমজানে রাতের ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—“হে চাদরে আবৃত! রাতের কিছু অংশ ছাড়া বাকি রাত দাঁড়িয়ে ইবাদত করো।”
— সূরা আল-মুজ্জাম্মিল (৭৩:১-২)
অন্যত্র বলা হয়েছে— “আর তারা রাতের কিছু অংশে তাদের প্রতিপালকের সামনে সিজদা ও কিয়ামে অতিবাহিত করে।”
— সূরা আল-ফুরকান (২৫:৬৪)
এছাড়া—“রমজান মাস—যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।”
— সূরা আল-বাকারা (২:১৮৫)
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, রমজানে রাতের ইবাদত বিশেষভাবে উৎসাহিত; তবে রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
৮ রাকাতের পক্ষে হাদিসভিত্তিক দলিল উম্মুল মুমিনীন আয়শা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন “রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ও রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি নামাজ আদায় করতেন না।”
সহী বুখারী, হাদিস নং ১১৪৭
সহী মুসলিম, হাদিস নং ৭৩৮
এই ১১ রাকাতের মধ্যে ৮ রাকাত কিয়াম ও ৩ রাকাত বিতর অন্তর্ভুক্ত বলে অনেক মুহাদ্দিস মত দিয়েছেন। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন—“নবী (সা.) আমাদের সঙ্গে রমজানে ৮ রাকাত এবং বিতর আদায় করেন।”
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রা.)-এর মাধ্যমে আয়েশা (রা.)-এর হাদিসে একই বর্ণনা পাওয়া যায়, যা সুন্নাহ আল-নাছায়ী এবং আবু দাউদেও এসেছে।
২০ রাকাতের পক্ষে সাহাবায়ে কেরামের আমল খলিফা ওমর ইনবে আল-কাতাব (রা.) তাঁর খেলাফতকালে মুসল্লিদের এক ইমামের পেছনে একত্রিত করেন। এ সম্পর্কে ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রহ.) বলেন—“উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে মানুষ রমজানে ২৩ রাকাত আদায় করতেন।” এখানে ২০ রাকাত তারাবী ও ৩ রাকাত বিতর অন্তর্ভুক্ত।
খলিফা আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সময়েও ২০ রাকাত তারাবী আদায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—“রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে ২০ রাকাত এবং বিতর আদায় করতেন।”
যদিও এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও ২০ রাকাতের সমর্থনে এটি উদ্ধৃত হয়ে থাকে।
ইসলামের প্রসিদ্ধ চার ফিকহি মাযহাব—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এর অধিকাংশ ইমাম ২০ রাকাত তারাবীকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মদিনা ও মক্কায় যুগের পর যুগ ২০ রাকাত তারাবী আদায়ের প্রচলন ছিল।
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, রাসূল (সা.) কখনো দীর্ঘ কিরাতে ৮ রাকাত আদায় করেছেন, আবার সাহাবায়ে কেরাম অধিক রাকাতে সংক্ষিপ্ত কিরাতে আদায় করেছেন। ফলে উভয় পদ্ধতিই ইবাদতের আওতায় বৈধ।
তারাবী নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান। কোরআনে নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ নেই। সহিহ হাদিসে ৮ রাকাতের প্রমাণ পাওয়া যায়, আবার সাহাবায়ে কেরামের আমল ও অধিকাংশ ফকিহের মতে ২০ রাকাতও প্রতিষ্ঠিত।
আলেমদের অভিমত, তারাবীর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি এবং রমজানের আত্মিক সাধনা। তাই ৮ রাকাত বা ২০ রাকাত—যে পদ্ধতিতেই আদায় করা হোক, পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখাই মুসলিম সমাজের জন্য উত্তম।